গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-১ আসনে এবারের নির্বাচনি হাওয়া বেশ জটিল ও বহুমুখী। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র—মোট পাঁচজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটের অঙ্ক সহজ হলেও রাজনৈতিক সমীকরণ সহজ নয়। জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কার সঙ্গে কার মূল লড়াই হবে, আর শেষ পর্যন্ত কে পরবেন এই আসনের ‘রাজটিকা’?
নিরপেক্ষভাবে মাঠ পর্যায়ের খোঁজখবর ও জনমত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিএনপির প্রার্থী ধানের শীষ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বল মার্কা। অর্থাৎ, এই আসনে লড়াইটি মূলত একই রাজনৈতিক ঘরানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন: শক্তির বদলে দুর্বলতা
বরিশাল-১ আসনে বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই চারজন কেন্দ্রীয় নেতাকে ঘিরে তীব্র গ্রুপিং বিদ্যমান ছিল। মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন এই চারজনই। শেষ পর্যন্ত দল একজনকে মনোনয়ন দিলে বাকি তিনজনের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়—যা মাঠে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারেনি।
মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী জনাব জহির উদ্দিন স্বপনের পক্ষে দলের সকল নেতাকর্মীর ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চারজনের মধ্যে একজন কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বল মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, যার ফলে তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন।
আংশিক ঐক্য, আংশিক নীরবতা
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সজল গাজী প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজ গ্রুপের নেতাকর্মীদের মাঠে কাজ করার নির্দেশ দেন। এটি বিএনপির জন্য কিছুটা ইতিবাচক হলেও পুরো চিত্রটি এখনো অসম্পূর্ণ।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে আরেক কেন্দ্রীয় নেতা, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) জনাব আকন কুদ্দুসুর রহমানের ভূমিকা। দলীয় দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে মাঠে সক্রিয় কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেননি। ফলে তার অনুসারীদের একটি বড় অংশ এখনো বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহানের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে—যা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।
ব্যক্তি বনাম দল: রাজনীতির পুরনো সংকট
ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহানের সমর্থকদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রত্যাশা ছিল ব্যালটের মাধ্যমে দলকে ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনার জবাব দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি আনুগত্য দলীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের কিছু পদধারী নেতা মাঠে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন—যা দলীয় শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
ধানের শীষের ভবিষ্যৎ কোথায়?
বরিশাল-১ আসনে এই চতুর্মুখী বিভাজন—একজন ধানের শীষের পক্ষে সক্রিয়, একজন বিদ্রোহী, একজন নিষ্ক্রিয় এবং আরেকজন আংশিকভাবে মাঠে—ধানের শীষের বিজয় সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দলীয় ঐক্য যেখানে সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা, সেখানে বিভক্ত নেতৃত্বই হয়ে উঠেছে প্রধান দুর্বলতা।
এখন প্রশ্ন একটাই—শেষ মুহূর্তে কি বিএনপি অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটিয়ে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে পারবে, নাকি ব্যক্তি স্বার্থ ও গ্রুপিং রাজনীতিই বরিশাল-১ আসনের ফলাফল নির্ধারণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুরো আসনের ভোটাররা।