
মোঃ ইউসুফ স্টাফ রিপোর্টাস :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নে বর্ষা মানেই নতুন আতঙ্ক, নতুন কান্না। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা, চাতালকল, মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হলেও স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধের দাবি আজও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি এলাকাবাসী প্রতি বর্ষায় নতুন করে সর্বস্ব হারাচ্ছেন শত শত মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, পানিশ্বর ইউনিয়নের পালপাড়া, সাখাইতি, দেওবাড়িয়া ও লায়ারহাটি এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে ভয়াবহ নদীভাঙন চলছে। নদীর তীব্র স্রোতে প্রতিদিনই ভাঙছে নতুন নতুন অংশ। ইতোমধ্যে ওসমান মিয়া ও আখতার মিয়ার চাতালকলসহ প্রায় ২০টি চাতালকল এবং শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েগেছে। গত কয়েক বছরে ভিটেমাটি হারিয়ে শতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। যারা এখনো টিকে আছেন, তাদের প্রতিটি রাত কাটছে আতঙ্কে পরবর্তী শিকার কি তাদের ঘর?
স্থানীয় কাউছার মিয়া, আবদুল কুদ্দুস মেম্বার, ওসমান মিয়া, সুমন মুন্সী মেম্বার ও মোবারক মেম্বার জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা একই দৃশ্য দেখে আসছেন। প্রতি বর্ষায় নদী কিছু না কিছু কেড়ে নেয়। তাদের ভাষায়, স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে অচিরেই অবশিষ্ট গ্রামও নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
পানিশ্বর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. তৌহিদ মিয়া বলেন, পালপাড়া, সাখাইতি, শোলাবাড়ি ও দেওবাড়িয়া গ্রামের কয়েকশ পরিবার সরাসরি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের একমাত্র দাবি স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ।
এ বিষয়ে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ শামীম বলেন, “পানিশ্বরের নদীভাঙন এখন আমাদের প্রতিদিনের কান্নায় পরিণত হয়েছে। বাজারের দুই পাশে স্কুল-কলেজ, অসংখ্য বাড়িঘর ও চাতালকল হুমকির মুখে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। আমি জনপ্রশাসন সচিবের মাধ্যমে জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানিয়েছি।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “প্রতি রাতে ভৈরব থেকে ২০-২৫টি ড্রেজার এসে, কখনো দিনের বেলাতেও, নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণেই পানিশ্বর এলাকায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে বালুখেকোদের আইনের আওতায় আনা না হলে পানিশ্বর বাজারও নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে। এই ঐতিহ্যবাহী জনপদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।”
শেখ মোহাম্মদ শামীম আরও বলেন, “তিন যুগ আগে পানিশ্বর ছিল সরাইলের অন্যতম সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল। শতাধিক চাতালকল ও অটো রাইস মিলকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। কিন্তু অব্যাহত নদীভাঙনে প্রায় ৮০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিলীন কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু আশ্বাস নয়, এখন প্রয়োজন স্থায়ী ও টেকসই নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পের বাস্তবায়ন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় বাড়ছে নদীভাঙন, বাড়ছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। যে জনপদ একসময় শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে আজ মানুষের প্রধান পরিচয়—নদীভাঙনের শিকার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরাইল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মহসিন কবির শিহাব জানান, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (পার্ট-১)’-এর আওতায় পানিশ্বর এলাকায় ১ হাজার ৩৫০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজের প্রস্তাব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রস্তাব আর জিও ব্যাগ দিয়ে কতদিন? যখন প্রতিদিন নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ঘর, জমি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকা, তখন স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া আর কোনো পথ দেখছেন না তারা।
সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, পানিশ্বরের নদীভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উপজেলা পরিষদের সীমিত বরাদ্দ দিয়ে এ ধরনের ভয়াবহ ভাঙন প্রতিরোধ সম্ভব নয়। দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর উদ্যোগ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন,বালু উত্তোলনের বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে এমন কোন অভিযোগ আসেনি, আমি এই বিষয়ে খতিয়ে দেখছি এমন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্টাফ রিপোর্টাস মোঃ ইউসুফ
০১৭৪৫-৭৮৬৮১১