
সংবাদ লিখলেই হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতায় অনেকটাই প্রশ্নের মুখে গণমাধ্যম পরিবেশ!
গৌরনদী বরিশাল স্টাফ রিপোর্টার এস এম নজরুল ইসলাম
গতকাল ছিল বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। প্রতি বছর ৩ মে দিনটি বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে পালিত হয়। UNESCO-এর উদ্যোগে ১৯৯৩ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, প্রেসক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিডিয়া হাউস আলোচনা সভা, মানববন্ধন ও সেমিনারের আয়োজন করেছেন।
কিন্তু আনুষ্ঠানিক আয়োজনের আড়ালে উঠে এসেছে এক জটিল বাস্তবতা—বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান চাপের পরিবেশ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: উদ্বেগই বেশি,
আন্তর্জাতিক ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশ গণমাধ্যম স্বাধীনতার দিক থেকে নিচের দিকেই অবস্থান করছে (সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ১৬০-এর কাছাকাছি অবস্থান ঘোরাফেরা করছে)। এই সূচক সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, আইনি পরিবেশ, রাজনৈতিক চাপ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।
দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে হুমকি, শারীরিক হামলা এবং মামলা দায়েরের ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। বিশেষ করে দুর্নীতি, ভূমি দখল, মাদক,
স্থানীয় রাজনীতি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিবেদন করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
অনেক সাংবাদিকের অভিযোগ,
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ আসে।ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের ভয় রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দুর্বলএমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বাধ্য হয়ে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটেন, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য বড় বাধা।
আইনি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ,
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কিছু আইন ও নীতিমালা সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে মামলা বা আইনি ঝুঁকি বেড়েছে বলে দাবি করা হয়।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে তা গণমাধ্যমের ওপর চাপ হিসেবে কাজ করে—এমন মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ইতিবাচক দিকও আছে,
তবে সবকিছুই নেতিবাচক নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা ও পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন চ্যানেল এবং বিকল্প মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে তথ্যপ্রবাহ দ্রুত হয়েছে।
অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতি উন্মোচন, সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরা এবং জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তরুণ সাংবাদিকদের অংশগ্রহণও বেড়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
প্রশ্ন থেকে যায়,
যেখানে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত হুমকি, মামলা ও চাপে কাজ করেন—সেখানে কতটা বাস্তবিক অর্থে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার দিন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা এবং আইনি সুরক্ষা জোরদার করা ছাড়া গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।
(তথ্যসূত্র),
(সাম্প্রতিক প্রতিবেদন)
* বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন (২০২৩–২০২৫)
* সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট
বাংলাদেশে গণমাধ্যম একদিকে যেমন বিস্তৃত ও সক্রিয়, অন্যদিকে তেমনি নানা সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকির মধ্যে আবদ্ধ। তাই দিবসটির মূল তাৎপর্য কেবল উদযাপনে নয়—বরং সমস্যাগুলো স্বীকার করে তা সমাধানের পথ খোঁজার মধ্যেই নিহিত।