
মোঃ মামুন রাজা,নিজস্ব প্রতিনিধি :
সুন্দরবনে হরিণশিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়া একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।বর্তমানে বাঘিনীটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে রাখা হয়েছে।বন বিভাগ জানিয়েছে,আগামী ৪৮ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত প্রাণীটিকে পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না।
গত রোববার বিকেলে বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় ট্রানকুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন করা হয়।পরে ফাঁদ কেটে উদ্ধার করে লোহার খাঁচায় করে খুলনায় নেওয়া হয়।বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইনজেকশন দেওয়ার দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে বাঘিনীটির জ্ঞান ফিরে আসে।
উদ্ধার হওয়া বাঘিনীটি দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকায় এর সামনের বাঁ পায়ে গুরুতর জখম হয়।বর্তমানে রেসকিউ সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাঘিনীটি অনেকটাই স্বাভাবিক রয়েছে।গতকাল রাত দুইটার দিকে খাবার দেওয়া হলে সেটি খাবার গ্রহণের চেষ্টাও করেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে গত শনিবার দুপুরের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে বাঘিনীটি ফাঁদে আটকে পড়ার খবর পায় বন বিভাগ।ঘটনাস্থলটি সুন্দরবনের পূর্ব অংশের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খাল-সংলগ্ন বনাঞ্চলে অবস্থিত।এলাকাটি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মধ্যবর্তী অংশে।
সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান,ফাঁদের রশিতে বাঘিনীটির সামনের বাম পা আটকে ছিল।এতে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং প্রাণীটি দুর্বল হয়ে পড়ে।এজন্য বাঘিনীটিকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৎস্যবিশেষজ্ঞ ও স্মার্ট ডেটা কো-অর্ডিনেটর মো.মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ট্রানকুইলাইজার গানের মাধ্যমে অচেতন করার পর নিরাপদে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও)মো.রেজাউল করিম চৌধুরী জানান,খুলনা অঞ্চলে বন বিভাগের ভেটেরিনারি সার্জন না থাকায় গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে বিশেষজ্ঞ দল এনে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়।অভিযানে ঢাকা ও খুলনার বিভিন্ন ইউনিটের বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নেন।
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন,বাঘিনীটি এখনো পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নয়।চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ৪৮ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।বাঘিনীটির সুস্থতার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ঢাকায় স্থানান্তর অথবা সুস্থ হলে উদ্ধারস্থলেই অবমুক্ত করা হবে।
বন কর্মকর্তারা জানান,বাঘিনীটি সম্ভবত গত শুক্রবার রাত অথবা শনিবার সকালে হরিণ শিকারের উদ্দেশ্যে পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়ে।ছিটকা ফাঁদে বেশি নড়াচড়া করলে ফাঁদ আরও শক্ত হয়ে যায়,যার ফলে মুক্ত হতে গিয়ে বাঘিনীটির পায়ে আঘাত লাগে।
উদ্ধার অভিযান চলাকালে ঘন বনের মধ্যে বাঘিনীর গর্জন এবং উৎসুক মানুষের ভিড় পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।শুকনা মৌসুমে খাল শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা উদ্ধার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে।
এ ঘটনায় অবৈধভাবে ফাঁদ পাতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে।বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।একই সঙ্গে সুন্দরবনে অবৈধ ফাঁদ পাতা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।